101>|| হাতি ধরা::- ||
আমার জিনের দুই তিন বার ভীষণ ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। একবার নীলগিরিতে হাতি ধরা, একবার সুন্দর বনে বাঘের সামনে।
অবশ্য ভয়ঙ্কর বাঘের সামনে আরও একবার পড়েছিলাম মধ্যপ্রদেশের
ভাটিনদার জঙ্গলে।
সে যাইহোক আজ বলবো হাতি ধরা দেখা,
ও কায়দা কানুনের কথা।
সে এক লোমহর্ষ কর ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার
কথাই বলবো আজ।
বছরটা হবে 1971 ফাস্ট ইয়ার বিএস সি
পরীক্ষার পরে সুযোগ পেলাম একটু ঘুরে বেড়াবার।
দাদাদের কোন্টাক্টরী কাজের জন্য মাটিকাটার লোক আনতে হবে।
উড়িষ্যার নীলগিরি পাহাড়ি অঞ্চল থেকে মাটি কাটার লোক সংগ্রহ করে আনতো
মুন্সী বলরাম নাহক, তাকেই প্রতি বৎসর দাদোন দিয়ে রাখা হত।
সেই বলরাম মুন্সীর কথায় ওর সাথে গিয়েছিলাম নীলগিরি পাহাড় অঞ্চলে
হাতি ধরা দেখতে। ওই পঞ্চ লিংগেশ্বরের পাহাড়ের কাছে ।
যারা হাতি ধরার ব্যবসা করে ওদের মুখেই
শুনে ছিলাম,ওরা হাতি ধরে সরকারের জন্য, সরকারকেই বিক্রি করে।
আর এটাই ওদের জীবিকা।
হাতি ধরা মানে জীবনকে বাজি রেখে একদল ভয়ংকর বন্য হাতিদের মাঝে
গিয়ে ওদের ভুলিয়ে নানান কায়দায় একটি গর্তে এনে বন্ধি করা।
বড়ো হাতি নয়, অতি চঞ্চল ছোট হাতি।
ওদের মুখে শুনলাম
হাতি ধরার পাঁচ রকম পদ্ধতির নানান কৌশল:---
●খোঁয়াড় বা খুঁটি/গোঁজ দিয়ে তৈরী খেদায়;
●স্ত্রী হাতিকে টোপ হিসেবে ব্যবহার; ●প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাতির পিঠে বসে ফাঁস ছোঁড়া;
●মাটির নিচে গোপন ফাঁদ পাতা; এবং গর্তে ফেলা।
সকল কথা বার্তা ও আনুষ্ঠানিকতার পর ঠিকাদার তার দক্ষ দলবল নিয়ে ও সাধারণ শ্রমিকের দল নিয়ে এসে তৈরি হতো হাতি ধরার জন্য।
সে এক ভীষণ অভিজ্ঞতা।
ওদের সাহস ও কেরামতি, একে কেরামতি না বলে অভিজ্ঞতার কায়দা কানুন বললেই ভালো হবে।
তাদের দলে দক্ষ মানুষ ছাড়া থাকতো
কিছু প্রশিক্ষিত হাতি যাদের বলাহয় খেদায় হাতি।
হাতি ধরায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ বেশ কিছু সাহসী মানুষ, আর ৪০-৫০ জন দক্ষ শ্রমিক। দক্ষ শ্রমিকরাই অন্য শ্রমিকদের খেদা নির্মাণে নির্দেশ দেয় ও কাজ তদারক করে।
স্থান নির্বাচনের ওপরই খেদার সাফল্য নির্ভর করে।
অভিজ্ঞ ও দক্ষ শ্রমিকের ৮-১০ জনের এক একটি দল স্থান নির্বাচন করে।
এমন করে বেশ কয়টি ভাগে ওরা যে যার নিজের মতন ছড়িয়ে পড়ে ।
সাধারণত হাতিরা পাল বেঁধে তাদের খাবার অর্থাৎ নানা ধরনের ঘাস, বাঁশের পাতা ও ডালপালা খোঁজে। হাতির দুই বা ততোধিক চলার পথ একত্রে মিশে শেষাবধি একটি বড় পথে পরিণত হলে
তাই ওই এক পথে চলতে পথের হাতিদের পথ চলার বা ওদের ভাষায় মাড়ানো পথটি দ্রুত মসৃণ হয়ে ওঠে।
কিছু ভূমি মালিক বুনো হাতি ধরায় টোপ হিসেবে স্ত্রী হাতি পুষে রাখে ।
এই ভাবে হাতি ধরা সে এক অস্বাভিক সাহসিকতার নিদর্শন যা দূর থেকে আবছা অন্ধকারে অনুভব করলাম।
এমন সাহসিকতার হাতিধরা কাছে থেকে দেখার কোন উপায় নাই , তাই দূর থেকে একটু অনুভব আর ওদের সাহসিকতার প্রমান স্বরূপ চাক্ষুস দেখলাম বুনো হাতির গলায় পায়ে লোহার চেন ও ম্যানিলা রোপের ফাঁদে আটকে থাকা জংলী ময়দা হাতি।(গজদন্তহীন পুরুষ হাতিদের বলে মাকনা। তবে ছোট পুরুষ হাতিকে পুরুষহাতিই বলে।)
স্ত্রী হাতির শ্রোণীচক্রে জড়িয়ে ও পিঠের উপর গুটিয়ে একটি লম্বা রশি রাখা হতো আর রশির শেষপ্রান্তে থাকত আলগা গেরো একটি ফাঁস। মাহুত বুনো হাতির গলায় ফাঁস ছুঁড়ে দিলেই তার হাতিটি চলতে শুরু করত আর ফাঁসটি বুনো হাতির গলায় আটকে যেত। ফাঁসবদ্ধ হাতি প্রায় শ্বাসরুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত ফাঁস টানা চলত। গ্রামবাসীরা অতঃপর হাতির পায়ে রশি বাঁধত এবং কিছুটা পোষ না মানা পর্যন্ত গাছের মোটা গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে রাখত।
এ পদ্ধতিতে ধরা হাতি আকারে ছোট এবং সাধারণত ২ মিটারের বেশি উঁচু হয় না।
খেদায় ধরা হাতির তুলনায় গলায় ফাঁদ পরিয়ে হাতি ধরা, হাতির বেশির ভাগই মারা পড়ে। মাঝে মধ্যে চোরা গর্তে ফেলেও হাতি ধরা হয়।
এজেন সেই 'নারায়ণ সান্যালের গজমুক্তা'!
মতন গল্পের কাহিনী ।
ওদের কথা শুনছিলাম আর
নারায়ণ সান্যালের গল্প কথা মনে করেছিলাম।
কি অদ্ভুত ও বিচিত্র ওদের জীবিকা।
প্রতি বৎস কিছু না কিছু মারাপরে।এই হাতি ধরার ফাঁদে।
একটু সামান্য টম ভুলের জন্য ওদের প্রাণ বিসর্জন দিতে হয় দাঁতলের পায়ের তলায় পিষে মরতে হয়।
তবুও ওরা প্রতিবৎসর হাতিধরা বায়না নিয়ে জঙ্গলে যায় হাতি ধরতে।
ওরা ওদের শুঁড়কে হাতের মতন করে ব্যবহার করে তাইতো ওদের হাতি বলাহয়।
<---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী---->
=========================
No comments:
Post a Comment